প্রলেতারিয়েতকে লেখা মুশফিক বরাতের চিঠি- ৪

প্রলেতারিয়েতকে লেখা মুশফিক বরাতের চিঠি- ৪

গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনে আমাদের যুক্তিগুলো ছিল- বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও ফার্মেসি কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানকে অবশ্যই ফার্মাসিস্ট হতে হবে। অথচ বিভাগীয় প্রধান মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ ফার্মাসিস্ট না হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে এ পদে বহাল রয়েছেন। দৈনিক যায় যায় দিন-এর সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধির ১৯ আগস্ট ২০০৭- নিউজে আসে, ‘সাভারের নয়ারহাটে অবস্থিত গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের প্রধান মেসবাহ উদ্দিনের অপসারণ দাবিতে ওই বিভাগের দুই শতাধিক ছাত্র গতকাল শনিবার ক্লাস বর্জন, প্রতীকী অনশন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে।’

পেশায় কেমিস্ট মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ ছাত্রদের ওপর বিভিন্ন সময় নানা ধরণের অনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে সিনিয়র ফার্মাসিস্ট নিয়োগ না দেয়া, অপেক্ষাকৃত জুনিয়র (পড়াশোনারত) শিক্ষক নিয়োগ, প্রসপেক্টাসে নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও অন্যায়ভাবে শিক্ষার্থীদের সেমিস্টার ড্রপের সিদ্ধান্ত দেয়া, প্র্যাকটিকাল ল্যাবে পর্যাপ্ত সুবিধা না দেয়াসহ আরো অনেক অভিযোগ রয়েছে। এখানে বলে রাখা ভালো যে, প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি আমি লিখেছিলাম। প্রেস বিজ্ঞপ্তি পড়ার পর সাংবাদিকেরা অবশ্য গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোন দিয়েছিল। রেজিস্টার দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছিলেন, ‘যোগ্য ফার্মাসিস্ট না পাওয়ায় মেসবাহ উদ্দিনের স্থলে কাউকে নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না।’

পত্রিকায় নিউজের আগে অবশ্য আমাদের অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। পুরো আন্দোলন সম্পর্কে একটি কথা বলে রাখা উচিত- আমি মনে করি। আন্দোলনটা ছিল আমাদের গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের (Department) একক আন্দোলন। পুরো গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক স্বার্থের আন্দোলন নয়। আন্দোলনটা অবশ্য সফল হয়েছিল। কারণ এর পরে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অনেক শিক্ষককে বাদ দেয়া হয়েছিল। আমরাও বেশ কয়েকজন বহিষ্কার হয়েছিলাম। মোট দশজন ছাত্রকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল। আমাকে প্রধান আসামীর মতো পুরাপুরি বহিষ্কার। বাকিদের কাউকে দুই বছর, কাউকে এক বছর- ছয়মাস- তিন মাসের জন্য সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে বাংলাদেশে যে-কোনো ছাত্র আন্দোলনের জন্য এটি একটি রেকর্ড। কেননা বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়-পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো একটি দাবি নিয়ে লাগাতার চল্লিশ দিন মিছিল হয়নি। আমরা গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিদিন দু’বার করে লাগাতার চল্লিশ দিন মিছিল করেছিলাম।আর সব সময়ই উপস্থিতি ছিল দুইশতাধিকের বেশি। সমগ্র বাংলাদেশের সবগুলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিতেও এতবড় জমায়েত নিয়ে লাগাতার আন্দোলন হয়নি। পত্রিকায় নিউজ প্রকাশের কয়েকদিন পর আমরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এক ঘণ্টার জন্য অবরোধ করেছিলাম। এরপরও বেশ কয়েকবার অবরোধ হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক অবরোধ কর্মসূচিতে এসেছিল এবং টিভিতে নিউজ দিয়েছিল। এরও আগে ১৫ আগস্ট ফার্মেসি বিভাগের সাত ব্যাচের সাত প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ডিন, রেজিস্টার ও কলা অনুষদের প্রধানের সঙ্গে চার ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক হলেও এ ব্যাপারে কোনো মীমাংসায় আসতে পারেনি। এখানে বলে রাখা উচিত যে, বাংলাদেশে মোট ৯২টি (৮০টি সক্রিয়, ১২টি আধা-সক্রিয়) প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এখনো পর্যন্ত কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এতে বড় সংঘবদ্ধ আন্দোলন সংঘটিত হয়নি। শেষের দিকে বাদবাকি সবগুলো ডিপার্টমেন্টের ছাত্র-ছাত্রীরাও মিছিল করেছে ও আন্দোলনে শরিক হয়েছে। অনশনেও অংশ নিয়েছে।

এই আন্দোলন-কর্মসূচিগুলোর বাইরে আরো অনেক আন্দোলন করেছি। এর পরে প্রগতিশীল শ্রমিক (Progressive Labour), প্রগতিশীল কৃষক-শিক্ষক-মহিলা-ডাক্তার-বিজ্ঞান-সংস্কৃতি (Progressive Farmers-Teacher-Women-Doctor-Science-Cultural Movement) আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি। তাছাড়া বাসদের বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চেও আমার নিয়মিত অংশগ্রহণ ছিল। এছাড়াও তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্দর ও খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির আন্দোলনেও (National Committee to Protect Oil, Gas, Mineral Resources, Power and Ports) আমার অংশগ্রহণ ছিল। সেসবের কথা পরবর্তীতে জানাবো। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *