প্রলেতারিয়েতকে লেখা মুশফিক বরাতের চিঠি- ৩

প্রলেতারিয়েতকে লেখা মুশফিক বরাতের চিঠি- ৩

আমার প্রিয় গায়ক কলকাতার জীবনমুখী গায়ক নচিকেতা। গায়ক নচিকেতার প্রায় সব গানগুলো আমার মুখস্থ। তখনো-এখনো। পাশাপাশি কবীর সুমন আর অঞ্জন দত্তের গানও শুনেছি প্রচুর। পড়াশুনায় ফাঁকি দেবার জন্য এগুলো করেই সময় কাটিয়েছি। কলেজের প্রসপেক্টাসে জমা দেয়া কবিতাটি ছিল তিন লাইনের। আমি দুষ্টুমি করেই তিন লাইন দিয়েছিলাম যেন ছাপা হয়। অবশ্য পরে ছাপাও হয়েছিল তবে আমার লিখিত বানানে নয়- ভুল বানানে। সম্ভবত একটা শব্দ (word) ভুল ছিল। আর ছোটগল্প সম্বন্ধে তো কিছু বলতেই হবে। আমি জানতাম, অনেক বড় বড় লেখকের অনেক বড় বড় কর্মের মাঝে ছোট একটা মুন্সিয়ানা ছোটগল্প কোনো অর্থই রাখে না। সেজন্যই অঞ্জন দত্তের পরিচিত গানটাকে ব্যবহার করেছিলাম। গানটার শিরোনাম ছিল- ‘অদ্ভুত ভালো লোকটা……।’ বামপন্থী একজন লোকের ছোট একটা জীবনীমূলক রচনা। যেখানে তার কিছু বৈশিষ্ট্যের দেখা পাওয়া যায়। আমি ঐ গানের বৈশিষ্ট্যগুলো ধরে একটা ছোটগল্প বানিয়ে ফেললাম। স্যারদের অবশ্য তাতে বোকা বানানো যায়নি। কবিতাটি ছাপিয়েছে; ছোটগল্প ছাপায়নি। এই আত্মজীবনীমূলক চিঠিতে আমার রাজনৈতিক জীবনের বর্ণনা খুব সামান্যই আছে। তাই কিছুটা বলে রাখা ভালো। আমার রাজনৈতিক জীবনের পুরোটাই কমিউনিস্ট রাজনীতির। ২০০৬ সালে আমি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর ছাত্র সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট-এ যোগ দেই। তখন কমরেড খালেকুজ্জামান পার্টির আহ্বায়ক ছিলেন। ইংরেজিতে পার্টির নাম হলো- Socialist Party of Bangladesh (SPB) আর ছাত্র সংগঠনের নাম Socialist Student Front (SSF). বর্তমানেও এই সংগঠনে আছি। ২০০৭ সালে এই ছাত্র সংগঠনে থাকাকালীন অবস্থায় ‘জোনাকী প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশ পায় আমার প্রথম উপন্যাস ‘বিন্দুতে মিশে’। এরপরে ‘দ্বান্দ্বিক বিবর্তন (Dialectical Evolution)’ নামে একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ আমি লিখি। যেটা নিয়ে পরবর্তীতে বেশ আলোচনা হয়েছে।

আমার মা সম্বন্ধে তো আগেই বলেছি। এবার বাবা সম্বন্ধে কিছু বলতে চাই। আমার বাবার নাম মোজাম্মেল হোসেন। ৪৫ বছরের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে পূর্ব পাকিস্তানে ঊনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থানের সময় গঠিত এগারো দফা ছাত্র আন্দোলনের নেতা ছিলেন। বর্তমানে বাবার বয়স ষাট বছর। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের করাচি শাখার প্রখ্যাত ছাত্র নেতা ছিলেন। দেশের বাইরে থাকাকালীন তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে ন্যাপ (ভাসানী) ও শ্রমিক আন্দোলনে করাচিতে দীর্ঘ সাত বছর (১৯৬৯-১৯৭৫) রাজনীতি করেছেন। তিনি একজন ভালো নাট্য অভিনেতাও ছিলেন। এরপর বাংলাদেশের লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির নাম গৃহীত হয় যে কংগ্রেসে সেই কংগ্রেসে ১৯৭৭ সালে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে জেলা ও কেন্দ্রের দায়িত্বে আসেন। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘকাল ‘বাংলাদেশ আখচাষী ইউনিয়ন’-এর জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নব্বুই-এর গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুরে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯১ সাল হতে অদ্যাবধি ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে করাচি শহরে দেয়াল লিখন ও সাইক্লোস্টাইল করে গোপনে প্রচারপত্র বিলি করেছিলেন। এজন্য তাকে পুলিশ তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি শহরে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করে। পার্বতীপুর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দাতা ও প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এছাড়াও পার্বতীপুর করতোয়া পল্লী শিশু ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। পার্বতীপুরের লোকোমোটিভ ওয়ার্কসপ (ব্যাকসপ) সংগ্রাম কমিটির নির্বাহী সদস্য ছিলেন। ব্যাকসপ হলো ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি রেলওয়ে প্রজেক্ট। এটি বাংলাদেশের একমাত্র এবং সর্ববৃহৎ রেলওয়ের পার্টস্ তৈরির কারখানা।

পার্বতীপুরের ‘একুশে চেতনা পরিষদ (Ekushe Chetona Parishod)’-এর প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক তিনি। বর্তমানে তিনি এ সংগঠনের সভাপতি। তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্দর ও খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটি (National Committee to Protect Oil, Gas, Mineral Resources, Power and Ports)-এর পার্বতীপুর শাখার আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। তিনি ফুলবাড়ী আন্দোলনেরও অন্যতম নেতা কেননা পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী একই সংসদীয় আসনের (দিনাজপুর-৫) অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানেও তিনি এ পদে বহাল আছেন। ইতিপূর্বে বাবা বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ও কেন্দ্রীয় সদস্য, পরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য, জেলা ও উপজেলা কমিটির সভাপতি/সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দিনাজপুর জেলা কমিটির সদস্য হিশেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাবার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন সম্বন্ধে দু’টি কথা না জানালেই নয়- তাই জানালাম।কলেজ পাসের পর রংপুরে কোচিং শেষে চলে গেলাম ঢাকায় উচ্চতর ডিগ্রির খোঁজে। আমার ইচ্ছে ছিল একজন লেখক হবার। তাই ঢাকায় যাবার স্বপ্ন আমার দীর্ঘদিনের। বাবা-মায়ের সাথে অনেক জেদাজেদির পর ঠাঁই হলো ঢাকাতেই। আমার বাবা ছিলেন পার্বতীপুর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও জমিদানকারী। তাই উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ঢাকাস্থ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অধীনে গণবিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় পৌঁছুলাম। প্রথমে হলাম গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মী। পুরো এক বছর স্বাস্থ্যকর্মী থাকার পর কিছু ছাড়ে (রেয়াত) ভর্তি হলাম গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে। ইচ্ছে ছিল এম.বি.বি.এস ডিগ্রি নেয়ার। কিন্তু অর্থাভাবে ভর্তি হওয়া হলো না ডাক্তারীতে। তাই ভর্তি হলাম ফার্মেসি বিভাগে। স্বাস্থ্যকর্মী থাকাকালীন অনেক ব্যস্ততার মাঝেও লিখে ফেলেছিলাম পুরো একটি উপন্যাস। উপন্যাসটি লিখেছিলাম ২০০৫ সালে। নাম- ‘বিন্দুতে মিশে’। উপন্যাসটি লিখতে আমার তিন মাস সময় লেগেছিল। অবশ্য প্রচেষ্টা ছিল বাইশ (২২) দিনের। উপন্যাসটি জমা দিয়েছিলাম ‘জোনাকী প্রকাশনীর প্রকাশক মঞ্জুর ভাইকে। মঞ্জুর ভাই-ই অবশ্য ছাপিয়েছিলেন। তবে দুই বছর পরে অর্থাৎ ২০০৭ সালে। উপন্যাসটি ছাপাতে ১০,০০০ টাকাও দিয়েছিলাম। গণবিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর পড়ার পর অবশ্য শুরু হয়ে গেলো আন্দোলন। আন্দোলনের নাম ছিল- ‘কেমিস্ট বিরোধী আন্দোলন’। আমাদের যুক্তি ছিল- আমরা পড়ি ফার্মেসি বিভাগে, তাই আমাদের বিভাগীয় প্রধান (departmental head) হবে একজন ফার্মাসিস্ট। আমাদের সময়ে অবশ্য ফার্মেসি থেকে পাস করা ছাত্রের হুড়োহুড়ি ছিল। অবশ্য শুরু করেছিলাম আমরা দু’জন। আমি আর রোমান। আমাদের ব্যক্তিগত কিছু স্বার্থও ছিল। গণবিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি ছিল না। আমি অবশ্য তখন ছাত্র রাজনীতিতে পুরোপুরি সক্রিয়। একের পর এক মিছিল ক’রে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় গরম করে ফেলছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ছিলেন কমরেড শামীম। আর সম্পাদক ছিল সৌমিত্র দা। আরো ছিলেন কমরেড প্রিন্স, কমরেড টুম্পা, মৈত্রীসহ আরো অনেকে। ছাত্রদের অধিকার আদায়ে আমরা অনেক মিছিল করেছি। এমনও দেখা গেছে, প্রতি সপ্তাহে আমাদের তিনবার মিছিল করতে হয়েছে। তাছাড়া প্রতি সপ্তাহে একবার মিছিলের কর্মসূচি আমাদের থাকতো। আমি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ঢাকা জেলার মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি ছিলাম। এ তো গেলো ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ন্ত্রিত কর্মসূচী। গণবিশ্ববিদ্যালয়েও আমরা কম ছিলাম না। ২০০৭ সালের আগস্ট মাসের ঘটনা এটি। দৈনিক যায় যায় দিন, দৈনিক আমার দেশ ও দৈনিক নয়া দিগন্তে আমাদের আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে গুরুত্ব সহকারে খবরও ছাপা হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *