প্রলেতারিয়েতকে লেখা মুশফিক বরাতের চিঠি- ১

প্রলেতারিয়েতকে লেখা মুশফিক বরাতের চিঠি- ১

মুশফিক বরাত আমার নাম। বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলায় আমার জন্ম। বাবা-মায়ের সন্তান বলতে আমি একমাত্র; ভাই-বোন নেই। বাবা আজীবন কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে জড়িত। মা-ও বাবার রাজনীতিতে সহযোগিতা করতেন। যদিও ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা (বর্তমানে প্রধান শিক্ষিকা)। মা চাকুরি করতেন প্রথম জীবনে পার্বতীপুর উপজেলার দক্ষিণ বিষ্ণুপুর গ্রামের এক প্রাইমারি স্কুলে। পরবর্তীতে বদলী হয়ে আসেন পার্বতীপুর উপজেলার রিয়াজনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমি প্রথমে ভর্তি হয়েছিলাম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। যেটা ছিল আমার নানীর তৈরি করা স্কুল। স্কুলটি প্রতিষ্ঠায় সর্বাধিক ভূমিকা রেখেছিলেন আমার নানী। ১৯৯১ সালে আমি ভর্তি হই আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ও পরবর্তীতে ভর্তি হওয়া রিয়াজনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরের দুই বছর আমি তেমন বুঝতাম না। আমি ভালোভাবে বুঝতে শুরু করলাম ১৯৯৩ সাল থেকে। এরপর থেকেই আমি প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করতে শুরু করলাম। বাংলাদেশের প্রাইমারি পঠনপদ্ধতি অনুযায়ী তৈরি হওয়া শিক্ষা ব্যবস্থায় তৃতীয় শ্রেণি থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণি এবং পরবর্তীতে হাই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আমি প্রত্যেক বিষয়ে প্রথম হতে থাকি। আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বর্তমানে আমার বাসার কাছে কালিবাড়ি (ইসলামপুর) গ্রামে পার্বতীপুর কমিউনিটি সেন্টারের পাশে অবস্থিত। এই কমিউনিটি সেন্টারে পার্বতীপুরের অধিকাংশ বিয়ের অনুষ্ঠানগুলো হয়। আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঠিক সামনেই রয়েছে জিন্নাহ মাঠ। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই মাঠে এসে একবার বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে মাঠটির নাম হয়েছে জিন্নাহ মাঠ। বর্তমানে যাকে বলা হয় স্থানীয় শহীদ ময়দান।

অতি ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি আমার চরম আগ্রহ ছিল।রসায়ন নিয়ে ভাবতাম।ভাবতাম পদার্থ নিয়ে যেমন আগ্রহ ছিল জীববিজ্ঞানের প্রতিও।কৈশোরে বেনজিন অ‍্যারোমেটিক যৌগ নিয়ে ভাবনা শুরু হয়।য‍ৌবনে যা ষষ্ঠতলকীয় মহাবিশ্ব ভাবনায় রূপ নেয়।বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখার মৌলিক দিকগুলোতে যেটা প্রধান ভূমিকা পালন করে।এমনকি বিগ ব‍্যাং-এর পূর্বেও বা এসময়টাতে ষষ্ঠতলকীয় ধারণা কাজ করতে পারে।মহাবিশ্বে প্রাণের অনুসন্ধানে পানির পাশাপাশি জৈব অণুর উপস্থিতিও প্রয়োজন।

আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমি পড়েছি মাত্র এক বছর। এরপর সেখান থেকে পড়তে চলে যাই রিয়াজনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। রিয়াজনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষিকা ছিলেন আমার মা। রিয়াজনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তৃতীয় শ্রেণি থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণি ও পঞ্চম শ্রেণিতে আমি সবগুলোতে প্রথম স্থান অধিকার করি। আমাদের সময়ে প্রতিটি শ্রেণিতে তিনটি পরীক্ষা হতো। ১ম সাময়িক, ২য় সাময়িক ও ৩য় সাময়িক। একটা স্মৃতির কথা আমার খুব মনে পড়ে। যখন আমি ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ি তখন রোমান ভাই ৫ম শ্রেণিতে পড়ে। আমার রোল এক, রোমান ভাইয়ের (আমার সিনিয়র বন্ধু) রোলও এক। আমি কারো সাহায্য না নিয়েই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর লিখে ফেলেছি। শুধু এক জায়গায় আটকে গেছি। সে জায়গাটুকু ফাঁকা রেখেছি। সেটা ছিল একটি ইংরেজি কবিতা। রোমান ভাই দেখে খুব অবাক হলেন আর আমি অবাক হলাম এই দেখে যে, তিনি আমাকে কবিতাটির অলিখিত লাইন হুবহু বলে দিলেন। যদিও সেটা তার গত বছরের পাঠ ছিল। এরপর প্রাইমারি স্কুলের পাঠ শেষে আমি চলে গেলাম পড়তে জ্ঞানাঙ্কুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। একটা কথা তো বলাই হয়নি। আমি প্রাইমারি স্কুলে বৃত্তি (বৃত্তি অর্থাৎ মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের স্কলারশীপ) পেয়েছিলাম। জ্ঞানাঙ্কুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষায় আমি প্রথম স্থান অধিকার করি। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ধাপে ধাপে মোট ১৫টি পরীক্ষা হয়। মাত্র একটি পরীক্ষা বাদ দিয়ে বাকি ১৪টি পরীক্ষায় আমি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম। জ্ঞানাঙ্কুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৫ সালে অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঠিক ৪ বছর পরেই। এটা ভাবতে খুব অবাক লাগে যে বিদ্যালয়টি ৯০ বছর যাবৎ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। ২০১৩ সালে আমি পার্বতীপুরের খোলাহাটি ডিগ্রি কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি (Graduation Degree) অর্জন করি।

২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর পার্বতীপুর থানার পার্শ্ববর্তী সৈয়দপুর থানার একটি মেয়ের সাথে আমার বিয়ে হয়। ওর নাম ইসরাত আরা (Esrat Ara)। ওর সাথে আমার আন্ডারস্ট্যান্ডিং (Under Standing) খুবই ভালো।

আমার খুব ইচ্ছে ছিল বাউবি’র ৫ম সমাবর্তনে উপস্থিত থাকার। কারণ এতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আবার বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকার কারণে আর পৌঁছুনো সম্ভব হয়নি।

আমি বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাথে জড়িত। বাসদে আমার আসা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট হয়ে। বর্তমানে ‘দ্বান্দ্বিক বিবর্তন’-নামক একটি বিষয়ের উপর আমার গবেষণা চলছে। আমি এ বিষয়টি নিয়ে পার্টির সাথে মতাদর্শিক বিরোধে জড়িত। আমার মতে, কোনো কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে থেকেই inner struggle-এর মাধ্যমে দ্বান্দ্বিক বিবর্তনকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। (………………………………………………………………)।

এই ছিল আমার প্রথম জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। বাকি জীবনের ইতিহাস আমি পরের চিঠিতে জানাবো। আপনার জীবনের ইতিহাস সম্বন্ধে আমাকে লিখে জানাবেন। আশা করি ভালো থাকবেন। Thank you.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *