সুন্দরবন রক্ষায় করণীয় দিকসমূহ — মুশফিক বরাত

সুন্দরবন রক্ষায় করণীয় দিকসমূহ — মুশফিক বরাত

আজ আমরা সুন্দরবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করবো। সুন্দরবন ধ্বংসে সরকারের চক্রান্ত লক্ষণীয়। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন সুন্দরবন রক্ষায় নানা কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। আমরা বেনজিন রিং সোসাইটির সদস্যরাও তাই উদ্বুদ্ধ হয়েছি। প্রথমে আমরা সুন্দরবনের নানা পজিটিভ দিক তুলে ধরবো আর শেষে আমাদের পাঁচ দফা দাবি সম্পর্কে জানবো।
       সিডর আঘাত হানে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর। এটি একটি ঘূর্ণিঝড় যা বাংলাদেশের উপকূল দিয়ে বয়ে যায়। সিডরের চোখের আয়তন ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বাধার কারণে সিডরে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল অনেক কম। সিডরের কারণে খোদ রাজধানী ঢাকাও রক্ষা পেয়েছিল। গাছপালার বাধা পেয়ে ঘূর্ণিঝড় সিডরের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার কমে গিয়েছিল। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা’র সামনেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সুন্দরবন এবং আইলা’র গতিও ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার ও জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা চার ফুট কমে গিয়েছিল। এভাবেই এই বনটি আমাদের বাংলাদেশকে বারবার বাঁচিয়ে চলেছে অথচ এই ঘৃণ্য সরকার সেই সুন্দরবনকেই ধ্বংসের অপচেষ্টা চালাচ্ছে! এমন সরকারকে অবিলম্বে দেশের শাসনভার ছেড়ে দেওয়া উচিত নয় কি?
       পর্যটকদের ফেলে যাওয়া পানির বোতল ও খাবারের প্যাকেটসহ নানা প্লাস্টিক আবর্জনায় দূষিত হচ্ছে বনের পরিবেশ। এর নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ছে বনের স্থলজ ও জলজ প্রাণীর জীবনচক্রে। আমাদের বাংলাদেশের পরিচয় ও শৌর্য-বীর্যের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রিয় আবাসস্থল এটি। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা ছাড়াও ফণী ও বুলবুলেরও মোকাবেলা করেছে এই বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটি। সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবনের ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে ও বাকিটা ভারতে অবস্থিত। এর ৬৯ শতাংশ স্থলভাগ ও ৩১ শতাংশ জলভাগ। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে ১১৪টি বাঘ, এক থেকে দেড় লাখ চিত্রা হরিণ, ৪০ হাজার বানর ও ২৫ হাজার বন্য শূকর রয়েছে। এ বনে স্থলজ প্রাণী রয়েছে ২৮৯ প্রজাতির অন্যদিকে রয়েছে ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর ও ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণী।        

       এই বনে অসংখ্য সুন্দরী গাছ জন্মে। ঘর তৈরি, ঘরের ছাউনি দেয়ার কাজে এই গাছের বড় পাতা খুবই কাজে দেয়। সুন্দরী গাছের মূলে রয়েছে ডায়াবেটিস প্রতিরোধী ঔষুধ। সুন্দরবনকে জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে সামুদ্রিক স্রোতধারা, কাদা চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ক্ষুদ্রায়তন দ্বীপমালা। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি হলেও বাঘ মামার কদাচিৎ দেখা পাওয়া যায়। সুন্দরী-গেওয়াসহ নানা বৃক্ষের মজবুত বেষ্টনী ও অসংখ্য নদীনালা যুগের পর যুগ এদেশকে রক্ষা করে আসছে।

         রামপাল-ওরিয়ন বিদ্যুৎ প্রকল্পের সকল অপতৎপরতা কেন বন্ধ করা জরুরী তা নিচে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হবে। এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য তিনটি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম সমস্যাটি হলো – চুক্তিটি অসম ও অস্বচ্ছ। দ্বিতীয় সমস্যা –  পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এ কারণে পুরোপুরি হুমকির মুখে। তৃতীয় সমস্যা হলো এরকম- প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম থেকেই অনিয়ম, নিপীড়ন আরম্ভ হয়েছে। সঠিক মূল্য না দিয়েই সাধারণ মানুষের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসী ও পুলিশ বাহিনী দিয়ে জোরপূর্বক গরীব মানুষদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।

       আরেকটি বিষয় জানা জরুরী। ২০০০ সালে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ইউনোক্যাল কর্তৃক বিবিয়ানা গ্যাসকূপটির উৎপাদন সর্বাংশে অতি সুলভ মূল্যে ভারতে রফতানির ষড়যন্ত্র হয়। তবে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বের কারণে এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। এখানে বলে রাখা উচিত যে, বেনজিন রিং সোসাইটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুধুমাত্র নাসা-কে সমর্থন জানায়। বেনজিন রিং সোসাইটি মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ব্যতিরেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্য সকল বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে।         

       রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প হলে কি কি ক্ষতি তা খতিয়ে দেখা যাক। বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু থাকা অবস্থায় ক্ষতি হলো-  ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ৫২ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড ও ৩১ হাজার টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গমন। তাছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি পরিবহনের ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, শব্দ দূষণ, আলো, বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি। কঠিন ও তরল বর্জ্য নির্গত হয়ে নদী, খাল দূষণ হবে এবং ড্রেজিং-এর ফলে নদীর পানি ঘোলা হওয়া ও তেল, গ্রীজ ইত্যাদি নিঃসৃত হয়ে নদীর পানির দূষণ। এখানে একটি উদাহরণ দেয়া জরুরী। টেক্সাসের ফায়েত্তি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ৩০ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হতো ফলে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হাইওয়ে ২১-এর ৪৮ কিমি এলাকা জুড়ে গাছ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
        রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো ওরিয়নের ৬৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও সুন্দরবনের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। দৈনিক ৬৮ টন বা বছরে প্রায় ২৫ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হবে। এই গ্যাস এসিড বৃষ্টি ঘটায় এবং ফুসফুস ও হৃৎপিন্ডের ক্ষতি করে। তাছাড়া দৈনিক ৪১ টন বা বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হবে। এই গ্যাস ফুসফুসের ক্ষতি করে যার ফলে শ্বাসতন্ত্রের রোগ হয়। কয়লা যতই ঢেকে পরিবহন করা হোক কিংবা জাহাজের গতি যতোই নিয়ন্ত্রণ করা হোক, তাতে জাহাজের কয়লাস্তুপ থেকে চুইয়ে পড়া কয়লা-ধোয়া বিষাক্ত পানি (বিলজ ওয়াটার), অ্যাংকরেজ পয়েন্টে কয়লা লোড-আনলোড করার সময় সৃষ্ট দূষণ, কয়লার গুড়া, জাহাজ নিঃসৃত তেল-আবর্জনা, জাহাজ চলাচলের শব্দ, ঢেউ, বনের ভেতরে জাহাজের সার্চলাইটের তীব্র আলো, জাহাজের ইঞ্জিন থেকে নির্গত বিষাক্ত সালফার ও নাইট্রোজেন গ্যাস ইত্যাদির ক্ষতিকর প্রভাব দূর হয়ে যায় না।

সুন্দরবন রক্ষায় বেনজিন রিং সোসাইটির ৫ দফা দাবি নিচে ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো –
(১) সুন্দরবনের চারপাশে ৩২০ শিল্প-কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাতিল কর, করতে হবে।
(২) সুন্দরবনের উপর সকল অনিয়ম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নাও। বনবিভাগের জনবল বৃদ্ধি কর।
(৩) রামপাল-ওরিয়ন বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ বাতিল করতে হবে। বনের পাশ ঘেঁষা সকল আবাসন প্লট অবিলম্বে বাতিল কর, করতে হবে।
(৪) অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটা, বনে আগুন লাগানো, বাঘ, হরিণ, কুমির ধরা বন্ধ কর।
(৫) সুন্দরবনের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষা-বিজ্ঞান চর্চা নিশ্চিত কর এবং তাদের জীবনধারণের জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *